২৭শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ / ১৩ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ / ১৯শে জিলকদ, ১৪৪৫ হিজরি / সন্ধ্যা ৭:১৮

খা খা খা বক্ষিলারে খা …

‘‘এই সাপের খেলা দেখবেন সাপের খেলা … ’’ বেদেনীর গলার এই আওয়াজ আসলেই ছুটে যেতো পিচ্চিরা। মাথায় বেতের ঝুঁড়ি থাকত। কোলের কাছে কাপড়ে গেটে ঝুঁলে থাকত কোন সুন্দরী বেদে রমনীর আদরের সন্তান। সাপকেও তারা নিজের সন্তানের মতই লালন পালন করেছে! কোমড় হেলে দুলে এই রঙ্গিলা শহর দাপিয়ে বেড়িয়েছে। এরাই ছিল প্রকৃত বেদে পরিবারের সদস্য। তারা ছিল ঘরবাড়িহীন। নৌকা জীবনেই জলে ভেসে ভেসে তারা গ্রাম থেকে শহরে আনাগোনা করেছে। সাপের খেলা দেখিয়ে পরিবার টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম করেছে। এই শ্রেণীর সাপুড়ে বেদে এখন নেই বললেই চলে! নৌকায় নৌকায় তাদের রান্না করার চিত্র শুধু উপন্যাসের পাতায় লিপিবদ্ধ আছে। সাপুড়ে পরিবারও কমতে কমতে এখন তলানিতে এসে ঠেকেছে। কালেভদ্রে যদিও দেখা মেলে এসব জনগোষ্ঠীকে। কিন্তু প্রকৃত সাপুড়ের দেখা মেলা যেন ভার!
সাপুড়ে লেবাসে পয়সার বিনিময়ে সাপ সংগ্রহ করে ভন্ড সাপুড়ে সেজে নেমে পড়েছে একশ্রেণীর প্রতারক ও লম্পট শ্রেণী। পুটলিতে দুই একটা সাপ গুজে নিয়ে এরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ফাঁকফোকড়ে সুযোগ খুঁজে সোনা গয়না মোবাইলসহ দামী জিনিস নিয়ে চম্পট দেয়ায়। অন্দর মহলের সহজ সরল মা বোনরাই সাপুড়ে নামধারী এসব ভন্ড-প্রতারকের শিকার হচ্ছে প্রায়। এসব দুষ্কৃতকারী লম্পটদের অনাচারেই ইদানীং মানুষ প্রকৃত সাপুড়ে ও বেদেকে ঘৃণা ও সন্দেহের চোখে দেখছে! যা তাদের সাপুড়ে পেশার ওপর একটি অবধারিত বজ্রাঘাত !
সমাজের চোখে এরা প্রকৃত সাপুড়ে নয়। এরা অপরাধী। এরা আদ্যোপান্ত বেদে জাতির জন্য অভিশম্পাত। এদের আনাগোনা কি গ্রাম কি শহর। সবত্রই। নিরিবিলি সুনশান এলাকার ভরা মানুষের ভীড় এদের টার্গেট। পিচ্চি পিচ্চি বাচ্চাদের সাপ খেলার প্রতি আকর্ষণ তৈরি করেই এরা মানুষের খুব কাছে চলে আসে। এমনকি কুৎসিত নজরেও বাড়ির মহিলাদের দিকে এরা সাপ খেলা দেখানোর ছলে তাকায়। এমনকি সাপকে টাকা দিতে বলে রমনীর কোমল হাতটি পর্যন্তও স্পর্শ করার মতো গর্হিত কাজ করে যায়। আসলে বাচ্চারা সাপ খেলা দেখার বায়না ধরে। ছেলেপুলের বিরক্তের হাত থেকে পরিত্রাণ পেতেই গৃহিনীরা সাপুড়ে নামধারী লম্পটদের বাড়ির উঠানে সাপ খেলা দেখাতে আমন্ত্রণ জানায়! এই আমন্ত্রণেই শুরু হয় মূল্যবাণ জিনিস খোয়ানোর লাগ ভেলকী লাগ ! সবাইকে সাপের খেলা দেখতে আরও বেশি সতর্ক হওয়া উচিত। সাপুড়ে প্রকৃত সাপুড়ে কিনা জেনে বুঝে এদের ডাকা উচিত।
ভন্ড সাপুড়ে মহিলাও হতে পারে। পুরুষও হতে পারে। তবে পুরুষের সংখ্যাই বেশি। খেয়াল রাখতে হবে। সাপ খেলা দেখানোটা তাদের উদ্দেশ্য কি না? সাপ খেলা দেখিয়ে খুশিমনে কেউ কোন টাকা পয়সা দিলে সেটা অন্য হিসাব। কিন্তু যদি লিকলিকে ‘সুতানাল’ সাপ দিয়ে আপনার মাথায় ছুঁয়ে কিংবা হাতে ছুঁয়ে বলে – মনোবাসনা পূরণ হবে। যার যা নিয়ত করে টাকা সাপের সামনে ধরেন। কিংবা কোন জংলা গাছের শিকড় বের করে যদি বলে- কাল নাগের দোহাই, এই শিকড় যার ঘরে থাকবে তার বাড়ি হবে নাকি সুখের স্বর্গ! জীবনেও কোনদিন কোন সাপ এই বাড়ির ত্রি-সীমানায় আসবে না। চোর ডাকাতের ভয় থাকবে না। আর কত শত বিপদ নাকি এই কামরুপকামাক্ষার শিকড়ে গ্রাস করে নিবে গায়েবী ভাবে… তবেই সাবধান। এমনও অভিযোগ শোনা যায়- সাপের খেলা দেখতে বসে অনেকের নাকের. কানের সোনার দুল খোয়া গেছে। অনেকে কান্নাকাটিও শুরু করে- আমার মোবাইল কই … বলে! সাধু সাবধান। সাপের খেলা চলবে ঠিকই। তবে পকেট সাবধান। মানিব্যাগও সাবধান।

প্রকৃত সাপুড়ে জানেও না তাদের দর্শক বিনোদনের আড়ালে কি ঘটবে? অথচ আদর্শ সাপুড়ে, এরা শুধু সাপ খেলা দেখাতেই আসে। দর্শককে দুই সাপের লড়াই আর সাপের সাথে গান গেয়ে মজার সুরে সাপ খেলা দেখানোই এদের আসল উদ্দেশ্য। ভন্ড সাপুড়ে ও লম্পটদের জন্য যে প্রকৃত সাপুড়েদের এই পেশাটি আজ কলুষিদ হচ্ছে এটাও একটা গভীর উদ্বেগের বিষয়। আসল সাপুড়েদের সংখ্যা কমতে কমতে ভন্ড সাপুড়ের সংখ্যা ঠিকই বেড়ে চলেছে। ঢাকা শহরও এখন প্রতারক সাপুড়ে বাহিনী থেকে মুক্ত নয়। খোদ ঢাকার ভিতরের নিম্ন এলাকাগুলোও এখন এসব দুই নম্বরী সাপুড়ে শ্রেণীর বিচরণভুমি। প্রশাসনের এদের বিষয়ে আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। সাপ খেলা এদেশের ঐতিহ্যেও ও সংস্কৃতির একটা অংশ। দেশের বিভিন্ন উৎসব পার্বনে বেদেরা সাপের খেলা দেখাতে আসতো। এই তো এবারও পহেলা বৈশাখে দেশের বিভিন্ন প্রান্তরে সাপের খেলা চোখে পড়েছে। “ খা খা বক্ষিলারে খা। লাল বিবিরে খা। জুয়ান থুইয়া বুড়াডিরে খা। এই খা খা খা। চাচারে থুইয়া চাচীরে খা। ” সুরে সুরে মজার কথায় দর্শককে বিনোদন দিয়েছে আমাদের সাপুড়ে জনপ্রতিনিধিরা।
সাপ প্রকৃতির অকৃত্রিম বন্ধু। উপকারী প্রাণী। এরা ক্ষতিকারক ইঁদুর খেয়ে ফসলের ও কৃষকের যথেষ্ঠ উপকার করে থাকে। সাপের কামড়ে মানুষ মারা যায় শুধুই দুর্ঘটনা বশতঃ। এরা অযথা মানুষকে আক্রমণ তো দুরের কথা। বরং মানুষের পায়ের আওয়াজ পাওয়া মাত্র নিজের জীবন বাঁচাতেই পালিয়ে যায়। সাপুড়ে ও ওঝার সংস্কৃতি থেকে আমরা এখনও বেড়িয়ে আসতে পারছি না। সে কারণেই সাপকে আমরা এখনও ধরে ধরে বাক্সবন্দী করে বিনোদনের খোরাকই মনে করছি। সাপের খেলা দেখিয়ে দুটো পয়সা হাতানোর ধান্দা করছি।
এসব না করে আসুন; আমরা সাপ নিয়ে বেশি বেশি গবেষণা করি। সাপকে নিরাপদ জীবন ফিরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করি। সাপের খেলার পিছু না ছুটে সাপের দেখভাল ও তত্ত¡াবধানে সরকারিভাবে এগিয়ে আসা উচিত। আমাদের পরিবেশবাদীরাও এক্ষেত্রে নিচ্ছে না জোড়ালো কোন পদক্ষেপ। ‘সাপ মারবেন না’ এ নিয়েও নেই কোন মানবিক উদ্যোগ। ভাবতেও অবাক লাগে, চীনারা ব্যক্তিগত উদ্যোগেও সাপের খামার করছে। একেকটা ফার্ম মারাত্মক সাপের বিষ বিক্রি করে বছরে ৩ মিলিয়ন ডলার আয় করছে। অথচ এই খামারটি চীনের জিসিকিয়াওতে ছোট্ট একটি গ্রামের সাপ চাষীদের বাৎসরিক আয় উপার্জনের গল্প। এরা কি প্রাণঘাতী এসব সাপকে বন্ধুবেশে সেবার মাধ্যমে আয় করছে না? বিশ্বের প্রতি বছর ২.৭ মিলিয়ন মানুষ বিষাক্ত সাপের কামড়ে আক্রান্ত হচ্ছে। সেই তুলনায় শুধুমাত্র চীনের প্রাণঘাতী সাপের বিষ থেকে প্রস্তুত এন্টিভেনম ভ্যাকসিন সারা বিশ্বের মানুষের জীবন বাঁচাতে সহায়তা করছে। ২০২৫ সাল নাগাদ এই ভ্যাকসিন চাহিদার সাথে আরও বাড়বে। যেমনটা আমরা দেখেছি চীনাদের করোনা ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে। চীনাদের কথা বলার মানে একটা কথার কথা। ভারত শ্রীলঙ্কার দিকে তাকাই। এশিয়ার দেশগুলি যেখানে ইতিহাস ঐতিহ্যে আমাদের চেয়ে শতগুনে এগিয়ে তারারও এখন সাপ চাষে মনোনিবেশ করেছে। গড়ে তুলছে বিষাক্ত সাপের খামার। সাপের বিষকে আরও কত সহজে মানুষের জীবন রক্ষায় প্রয়োগ করা যায়- এ নিয়ে চলছে, প্রযুক্তিগত আধুনিক গবেষণা।
একদিকে গবেষণা। অন্যদিকে প্রাণঘাতী সাপের বিষ থেকে আকাশছোঁয়া অর্থোপার্জন। মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার বাৎসরিক আয়। সাপুড়ে বেদে সমাজকেও খুঁজে এনে প্রয়োজনে প্রতিটি খামারের সাথে সম্পৃক্ত করুন। তাদের সাপ খেলার রুটি রুজির বিকল্প হিসেবে সাপের খামারী হিসেবে গড়ে তুলুন। প্রতিটি সাপুড়েই দেখবেন- ভূয়া ঝারফুঁক কালচারকে গুডবাই জানাবে। এন্টিভেনম এর সাথে হবে সবার নিবিড় বন্ধন। এবং সাপের সাথেও তাদের আচরণ হবে বন্ধুত্বের। প্রগাঢ়। আর ভালোবাসার।

মারুফ আহমেদ, বিশেষ প্রতিবেদক
ছবিঃ অনলাইন