৩রা মার্চ, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ / ১৯শে ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ / ২২শে শাবান, ১৪৪৫ হিজরি / রাত ১:৩৩

গুলশানের লেলিহান আগুন, খুলে দিক সচেতনতার দুয়ার

জাতি লাইভে যেন হলিউড মুভি উপলব্ধি করল!

উঁচু ভবন থেকে বাঁচার আকুতি নিয়ে মানুষ কিভাবে লাফিয়ে পড়ছে, উফ …এভাবে কী বাঁচা যায়? প্রশ্নটা জাতির। তাদের উদ্দেশ্য। যারা বহুতল ভবনের অনুমোদন দেয়। নিয়মনীতি না মেনে। দেদারছে একটার পর একটা বহুতল ভবনের যারা সৃষ্টা? তাদের বিবেক জানিনা কতটা নাড়া দিয়েছে, গতরাতের এই দুর্ঘটনায়। একজন নারীর ওপর থেকে লাফিয়ে পড়ার নিদারুণ করুণ চিত্রটি পুরো জাতির বিবেককেই কাঁপিয়ে দিয়েছে। দেখেছে সারা দেশের মানুষ। আর প্রত্যক্ষদর্শীরা দেখেছে থেতলে যাওয়া নিথর লাশ! আগুন কতটা ভয়াবহ ছিল গতরাতের সেচ্ছাসেবক, গুলশানের সাধারণ মানুষ, মিডিয়াকর্মী ও ফায়ার সার্ভিসসহ সরকারী উদ্ধারকর্মীরাই অবগত। দেশে যেখানেই, যখন আগুন লাগে। ফায়ার ইউনিট আগুন নিভাতে চলে আসে। গতরাতেও ব্যতিক্রম হয়নি। একটার পর একটা ফায়ার ইউনিট ছুটে এসেছে। তবে, প্রাণহানীর অনেক পড়ে। বিগত কয়েকটি আগুন দুর্ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের বিলম্বতা ও আগুন লাগার সময় বাড়ির মালিক শ্রেণীর গেইট বন্ধ রাখার মত অমানবিক নিষ্ঠুরতার কথাও আমরা কম বেশি শুনে থাকি। গতরাতের গুলশানের আগুনের তান্ডবেও সেই একই নমুনা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। কিন্তু ভাবতেও অবাক লাগে। এত বড় উঁচু ভবন। ১২ তলা। আধুনিক অগ্নিনির্বাপক সিস্টেম নাই? এই বাড়ির অনুমোদন নিয়েও এখন রাজউক ও বহতুল ভবন নির্মান প্রতিষ্ঠান প্রশ্নবিদ্ধ?

বিপদে সবসময়ই আগে এলাকাবাসী, সাধারণ মানুষ সবসময়ই সেচ্ছাসেবকের বেশে বীরদর্পে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সরকারি মহলের তৎপড়তা, মন্ত্রী এমপি মেয়র প্রসাশন ও বিভিন্ন বাহিনীকে আমরা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতে দেখি। অথচ উনাদের কাছেই জাতির প্রত্যাশা সবচেয়ে বেশি। গতরাতে ঢাকা উত্তরের সিটি মেয়র আতিকুল ইসলামও ছিলেন। যিনি সরাসরি এই ভয়াবহতা উপলব্ধি করেছেন। উনার মত বাকী সব মেয়র মহোদয়দেরকেও নিজ নিজ এলাকার উন্নয়ন ও নাগরিক জীবনের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে, এখন থেকেই, প্রতিটি বহুতল ভবনের জন্য – উপযুক্ত নিয়মাবলী নিয়ে কাজ করাটা জরুরি। সবাই দেখেছে বহুতল ভবনের ছাদে আটকে পড়া ১৬ জন মানুষের বাঁচার আকুতির সকরুণ চাহনি। সবাই কিভাবে যে সৃষ্টার পানে তাকিয়ে ছিলো, সেই বিরল দৃশ্যটি’ তারাই বুকের পাজরে সবচেয়ে বেশি অনুধাবন করছেন, যাঁরা রাতে তাদের শুধু গলা ফাটিয়ে বলেছেন – প্লিজ কেউ লাফ দিবেন না। সবাইকে উদ্ধার করা হবে। আপনাদের কিচ্ছু হবে না … কথাগুলো। রাজধানীতে ডেভলপার হোক, বাড়িওয়ালা স্বয়ং নিজে হোক, বাড়ির বাইরে যে যত রঙ আর বাহারী বহুতল ভবন নির্মাণ করুন, ভিতরে কোনটিই যে নিরাপদ জীবনের জন্য যথেষ্ঠ নয়। সেটাই গতরাতে প্রমাণিত। আরও বেশি প্রমাণিত বিষয়টি হচ্ছে, আমরা ‘আগুনসহ যে কোন দুর্ঘটনায় এখনও আধুনিক প্রযুক্তিগত দিক থেকে অনেক অনেক পিছিয়ে’। এটা দিনের আলোর মত আজ পরিস্কার। যে দেশে মানুষ লাফিয়ে পড়ে যায়। নিচ থেকে মানুষকে অবলোকন করা ছাড়া কোন উপায় নাই ? হায় আধুনিকতা ! উদ্ধারকারীরাও যেন ছিলো পুরো অসহায় ? এমনও এলাকায় এত বড় বড় উঁচু ভবন আছে, যেসব বাড়িতে হেঁটে যেতেও মানুষের গায়ের সাথে গা লেগে যায়। এমন সরু রাস্তায় এতবড় বড় বহুতল ভবনগুলো কোন ইশারায় আকাশপানে তাকিয়ে আছে ? আমরা তো গতরাতের এক গুলশান ২ এর বহুতল ভবন নিয়ে কথা বলছি। ভাবুন, বিধাতা না করুন, যদি ঔসব সরু গলির কোন একটা ভবনে আগুন লাগে ? কি হবে ? যেখানে রিকশাই প্রবেশ করে না। ফায়ার সার্ভিসের কোন গাড়িটি আসবে আপনার বাড়ির আগুন নিভাতে। কোন এ্যাম্বুলেন্স আসবে জলন্ত কয়লামানবকে বার্ন ইউনিটে নিতে ? বললে তো অনেক কথা। না বললে চুপটি করে লাশ দেখাই মনে হয় ভালো আমাদের ! তারপরও বলি, আমাদের আধুনিক প্রযুক্তিগত দুর্বলতা দুর করতে হবে। বাজেটে এসব খাতকে প্রাধান্য দিতে হবে। জননিরাপত্তার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাজেট প্রণয়ন করাটা এখন ভাববার বিষয়। প্রতিটি বাড়ির আশে পাশে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। সংর্কীর্ণ রাস্তার চারপাশ খোলা রাখার জন্য অবৈধ দোকানপাট তুলে দিয়ে, রাস্তাঘাটে মানুষের চলাচলের সুব্যবস্থা করতে হবে। আর বহুতল ভবন মালিকদের বাড়িতে পর্যাপ্ত পানির উৎস না থাকলে, সেখানে বিকল্প ব্যবস্থা কিভাবে করা যায়, সেদিকাটায়ও জোড় দিতে হবে। কেননা দুর্ঘটনার তো শেষ নাই। আমাদের এখন থেকেই সচেতন হওয়াটা বিশেষ প্রয়োজন। সচেতনতারও তাই নাই কোন বিকল্পতা।

তবে জাতি কাল দেখেছে, ফায়ার ফাইটাররা ছাড়াও- আনসার, পুলিশ, র ্যব , সেনা, বিমান, নৌসহ প্রতিটি বাহিনীর সদস্যরা কতটা তড়িৎ বিপদ মোকাবিলার জন্য কিভাবে ছুটে এসেছেন। যা আমাদের সত্যি খুব আপ্লুত করেছে। সামনে এই বিষয়টি আরও গুরুত্ব পাবে বলেই আমরা বিশ্বাস করি। সবার এই মানবিক উদ্ধার অভিযানেই কিন্তু কাল ২২ জনকে জীবন্ত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। যা ছিল সত্যি প্রশংসনীয়।

মারুফ আহমেদ, বিশেষ প্রতিনিধি

ছবি: ইন্টারনেট