১৯শে এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ / ৬ই বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ / ১০ই শাওয়াল, ১৪৪৫ হিজরি / রাত ৯:৩২

পুড়ে কয়লা মানুষ, এত মৃত্যুর দায় কার?

বেইলি রোড। ঢাকার ব্যস্ত নগরি। সন্ধ্যার পর থেকেই শুরু হয় এলাকার আড্ডা, আহার ও আয়োজনের নানান পসরা। বিশেষ করে বিত্তবানদের একটা প্রিয় এলাকা। থিয়েটার পাড়া নামেও পরিচিত বিধায়, বেইলি রোডের ব্যস্ততার কথা বলার কোন অবকাশ নেই। পাশাপাশি আছে নানান অফিস। নামীদামী স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যায়ল। মূলতঃ এত মানুষের আনাগোনার ফায়দা লুটেই একশ্রেণীর লোভাতুর রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী এলাকাটাকে নিউইয়র্ক সিটির মতো জমকালো রূপদানে শুরু করে রেস্টুরেন্ট ও খাবার দাবার ফাস্টফুড ইত্যাদি বাণিজ্যিক কর্মকান্ড। ভবনটির সিঁড়িতে সিঁড়িতে খাবারের দোকান। সিঁড়িতে সিঁড়িতে রাখা থাকত গ্যাসের সিলিণ্ডার। কেউ দেখেও দেখত না। ভয়ও পেত না। এগুলোর বিস্ফোরণ নিয়েও মানুষের মনে কোন আতঙ্ক হয়নি। আর হয়নি বলেই সরকারের নিয়মনীতির ধার না ধেরে ঢাকার পথ ঘাট এমন কোন বাসাবাড়ি আবাসিক এলাকা নেই যেখানে যত্রতত্র ফেলে রেখে ব্যবসা করা হয় এসব এলপিজি গ্যাসের সিলিণ্ডারের। আর বেইলি রোডে এত অতিরিক্ত রেস্টুরেন্ট হওয়া শুরু হয়েছিল যা কল্পনাতীত। অথচ পনের বিশ বছর আগে এই এলাকাই ছিলো নাট্যপিপাসুদের প্রাণের বেইলি রোড। থিয়েটার কর্মীরা সন্ধ্যার পর থেকে রাত অবধি এখানে শিল্প সংস্কৃতি বিষয়ক আলাপচারিতায় মুখর থাকত। মহিলা সমিতি মঞ্চ ও গাইড হাউস মঞ্চ ছিল মঞ্চায়নের প্রধান দুটি হল। এরপর শিল্পকলা একাডেমি চালুর পর থেকেই থিয়েটারের সব আড্ডা আয়োজন চলে যায় সেগুণবাগিচায়। আর মিডিয়া কেন্দ্রিক আড্ডা চলে যায় মগবাজার ইস্কাটন রোডে। এই সুযোগে বেইলি রোড নতুন ভাবে জেঁকে বসে খাবারের বাণিজ্যে! আর সুউচ্চ জমকালো শপিংমলের ভবন গুলোর কথা তো বলতেই হয়। ঢাকায় বসে এরা বেলজিয়ামের কাঁচের শহর তৈরিতেই যেন বেশি ঝোঁক। মালিক ও ইঞ্জিনিয়ারদের এতটাই কৃতিত্ব এরা মানুষের নিরাপত্তার কথা প্ল্যানে না রেখে কাঁচভবনের অপরূপ সৃষ্টিতেই বেশি মনোনিবেশ দেখছি। এর ফলশ্রুতিতে আমরা কি পেলাম? গতরাতে? ৪৪ জন তরতাজা কয়লা মানব! আহা! বলতেও হৃদয় ফেটে যায়। তবু প্রশাসন নিয়ম না মেনে ভবন নির্মাতাদের বিরুদ্ধে এখনও পর্যন্ত কোন অগ্নিকান্ডের পরও কঠোরতার ছিটেফোটা দেখাতে পারছে না? ৪৪ জন কেউ বলছে আরও বেশি প্রিয়জন হারিয়েছে পরিবারগুলো। ফায়ার ডিফেন্সের লোকেরা বলছে আরও সনাক্তকরণ করা যায়নি এমন মানুষের নিহতের খবর। ধরেই নেওয়া যায় ৪৫ থেকে ৫০ জন। আর হাসপাতালে পোঁড়া দেহে কাতরাচ্ছে যে কত শত জন। কত জন যে ভবন থেকে প্রান বাঁচাতে আগুনদেহেই লাফিয়ে পড়েছেন এত উঁচু ভবন থেকে। এই মানুষগুলো বেঁচে থাকা আর না বেঁচে থাকা সমান কথা। অনেক অনেক রোগীর অবস্থা আছে সংকটাপন্ন। কণ্ঠনালী পুঁড়ে প্রায় মৃত্যুর দেশেরই যাত্রী এরা।

রাতেই স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন বিষয়টি পরিস্কার করেছেন সাংবাদিকদের। তিনি নিজেও একসময়ের বার্ণ ই্উনিটের প্রধান ত্রাতা ছিলেন। সুতরাং আগুণে ঝলছে ওঠা মানুষের যন্ত্রণা তিঁনি সবার চেয়ে বেশিই অনুভব করবেন। এবং আমরা আশা রাখি এমন বড় রকমের দুর্ঘটনা রোধে কি করণীয় বিশেষজ্ঞ মহলের সাথে বসে সময় এখনই নতুন করে আরও উন্নত পরিকল্পনা গ্রহণ করা। বাজেটে শুধু খাতই বাড়ে। অর্থের লাগামহীন ঘোড়ার মতই ছুটতে থাকে। কিন্তু আগুন নিভানো ও মানুষ বাঁচানোর জন্য আধুনিক প্রযুক্তির লেষমাত্র দেখিনা কখনও! এই যে আমিই লেখলাম। সেই আমাকেই আরও একটা বড় দুর্ঘটনায় পুনরায় বাজেটে সরকারকে আধুনিক প্রযুুক্তির বিষয়টি মনে করিয়ে দিতে হবে। সুতরাং আমরা কি বঝব? আগুন একটার পর একটা লাগবেই। দুর্ঘটনা একটার পর একটা ঘটবেই। ৪০ জন ৫০ জন পৃথিবীকে বিদায় জানাবে। আর গায়ে আগুন লাগা মানুষগুলা বহুতল ভবন থেকে হলিউড মুভির বেশে জীবন বাঁচাতে ঝাঁপিয়ে পড়েই রাস্তার ওপর লাশ হয়ে পড়ে রবে? সারা বিশ্ব দেখছে এমন সকরুণ মৃত্যু?

উন্নয়নের জোয়ারে যতই বলি, আমরা এগিয়ে যাচ্ছি? সবকিছুর আঁড়ালে থেকে যাবে অসহায় দেশবাসীর গুমড়ে কান্না। আর আপনজন হারানো পরিবারগুলোর দীর্ঘশ্বাস?

স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজেও বলেন, ‘‘হাসপাতালে ভর্তি হওয়াদের সবার অবস্থা আশঙ্কাজনক। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আছে ৩৩ জন এবং শেখ হাসিনা জাতীয়বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটেও অনেক রোগি আছেন। মারা গেছেন সেখানে ১০ জন। অনেক আহতরা এলাকার কাছাকাছি রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালেও ভর্তি আছেন। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। যাঁরা এখনও বেঁচে আছেন, সবাইকে সুস্থ করার চেষ্টা চলছে। শরীরের বাইরের পোড়ার চেয়ে ভেতরে পুড়ে গেছে বেশি। তিঁনি আরও বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সবাইকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।‘‘ ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল মো. মাইন উদ্দিন জানান, ‘‘ অচেতন অবস্থায় ৪২ জনকে হাসপাতালে নেয়া হয়। এরমধ্যে ৪ জন শিশু ও ২১ জন ছিল নারী। বাকীরা সবাই পুরুষ। জীবিত উদ্ধার করা হয় ৭৫ জনকে।‘‘ রাত প্রায় ১২ টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসলেও আগুন লাগে গতরাত ঠিক প্রায় ১০ টায়। স্থানীয়রা আগুন নিভাতে এগিয়ে আসলে ফায়ার সার্ভিসের ১৩ টি ইউনিটও সাথে সাথেই আগুন নিভাতে চেষ্টা করে। ৭ তলা ভবনটি কাচ্চি ভাই রেস্টুরেন্ট নামে খ্যাত। এখানে খানাস, ফুকো, অ্যাম্ব্রোশিয়াসহ কয়েকটি রেস্টুরেন্ট। প্রাথমিক তদন্তে সিলিণ্ডার গ্যাসকেই দায়ী করা হচ্ছে। এই ভবনের দোতালায় ছিল কয়েকটি কাপড়ের দোকান। এগুলোও ভস্মীভূত হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক মহোদয় আরও বলেন, ‘‘পুরো ভবনের প্রতিটি তলায় রেস্টুরেন্ট থাকায় এখানে সিলিণ্ডার গ্যাস মজুদ রাখা হয়। আগুন লাগলে সেটা প্রজ্জ্বলিত হতে সময় নেয়নি। ফায়ার সার্ভিস উদ্ধারের পাশাপাশি বিষয়টি তল্লাসীও করছে।‘‘ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধরি আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে আরও একজন মারা গেছেন। যাদেরই উদ্ধার করা হয় সবাই গুরুতর আহত। আগুন নেভানোর পর সাফোকেশনের জন্যই অনেকের শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। অনেকে আগুনেও পোঁড়ার ভয়ে লাফিয়ে পড়েও আহত হয়েছেন বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।‘‘ রাত আড়াইটা পর্যন্ত সবার ব্যস্ততা উদ্ধার তৎপড়তা ছিল। ইতিমধ্যেই ভবনটি সিলগালা করেছে নিরাপত্তায় থাকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গঠন করা হয়েছে ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি।

অথচ গতবছর অক্টোবরেও এমনই একটি বহুতল ভবনে আগুণে লাফিয়ে মানুষের মৃত্যুর খবর দেশবাসীর মনে এখনও আগুনের লেলিহান শিখার মতই জলন্ত!

খাজা টাওয়ারে ১৪ তলা ভবনের ১৩ তলায় আগুনের ঘটনায় ১৬ ঘন্টা দেশের সাধারণ মানুষ আর সকল বাহিনীর আগুন নিয়ন্ত্রণের যে কঠিন চিত্র। সেই ঘটনা এখনও একটি বছর পেরুতে পারে নাই। ঘটে গেলো বেইলি রোড ট্রাজেডী! বিগত দশ পনের বছর দেশটির সাধারণ মানুষের জীবন যেন এতটাই তুচ্ছ মনে হচ্ছে। যেন আগুন লাগবে। আর মানুষ মরবে। এটা এমন একটা স্বাভাবিক বিষয়ে রূপ নিতে শুরু করেছে। কিন্তু দেশবাসীর শঙ্কিত জীবন নিয়ে এই শহরে শান্তিতে শ্বাস ফেলবার ফুসরত মিলছে না মোটেও। অথচ বিগত এই ১৪ বছরে মারা যায় ২৬৭ জন। নিমতলী ট্রাজেডী, এফআরটাওয়ার ট্রাজেডী, বঙ্গবাজার, নিউমার্কেট, মগবাজার বিস্ফোরণ, খাজা টাওয়ার ভস্মীভূত হয়ে শেষ আগুণের রেকর্ড ছিলো গতকাল বেইলি রোডে গ্রীন কোজি কটেজ ট্রাজেডী!


সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মানুষ ২ ঘন্টার বেশি সময়ের আগুনের লাইভে মানুষের করুণ পরিণতি দেখে পুরোই পুরোই যেন বাকহারা! এতবড় একটা ভবন কোন নিয়ম তোয়াক্কা নেই কোজি কটেজ না দিয়ে এটার নাম দেয়া দরকার ছিলো- রেস্টুরেন্ট ভবন! এ যেন একটা জীবন্ত সিলিণ্ডারের ফ্যাক্টরী বানিয়ে রেখেছে। নেই বিকল্প কোন সিঁড়ি। নেই অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রপাতি। নেই ট্রেইনিং ও নিরাপত্তারক্ষক কোন ফায়ার গাইড। নেই ভবন তৈরির আগে পরে রাজউকের কোন তদারকি টীম! যদি থাকত তাহলে এমন প্রশাসনিক এলাকায় এত নামী ভবনের সিঁড়িতে সিঁড়িতে গ্যাস সিলিণ্ডার থাকলে দেখার কেউ থাকবে না কেন? নাকি অন্য কোন কারণে অনেক কিছুই প্রশাসনকে দেখেও না দেখার ভান করতে হয়?

যে যার খুশি মতো বানিয়ে রেখেচে জৌলুস ভবন! কে বাঁচল আর কে মরল। এসব ডেম কেয়ার হয়ে থাক। আকাশচুম্বী ভবন করতেই থাকো। এই ভবনটিতে এবার কে কে কাচ্চি খাবে, বেইলি রোড আসো? কাচ্চির নিমন্ত্রণের এই অসহায় আত্মসমর্পণ বিশ্বে বিরল! তারপরও CID, ফায়ারসার্ভিসিস, পুলিশ, RAB সবাই বরাবরের মতোই বলে যাবে, ক্যামিকেল পরীক্ষা হবে। উদঘাটন হবে দুর্ঘটনার কারণ। অন্যান্য দুর্ঘটনার মতো হতে থাকবে তদন্ত কমিটি। এবং হতেই থাকবে। চলবে মোটিভ নিয়ে গবেষণা। কিন্তু ফলপ্রসু কোন পদ্ধতি নিয়ে দেখব না কোন তাত্ত্বিক গবেষণা?

দেখা যাবে না প্রকৃত দোষীদের কোনরূপ শাস্তি?

মারুফ আহমেদ, বিশেষ প্রতিনিধি