২৮শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ / ১৫ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ / ১৮ই শাবান, ১৪৪৫ হিজরি / রাত ১:৩৭

ভুমিকম্পে আরও বড়ঝুঁকির শঙ্কায় রাজধানী ঢাকা

বড়রকমের প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিবেচনায় এখনই প্রয়োজন সতর্কতামূলক কর্মসূচী

দরকার সরকারি বেসরকারি পর্যায়ে ক্যাম্পেইনিং। আবাসিক ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে প্রাকৃতিক হুমকি মোকাবিলায় উপযুক্ত করণীয় বিষয়ে, সবাইকে সচেতন করা। ২ ডিসেম্বর, ভুমিকম্প থেকে আমরা কতটা সতর্কতা শিখলাম। কি তান্ডবটাই না ঘটে গেল এদিন সকালবেলা।

যাদের ঘড়ির সময় ১ সেকেন্ড কম। তারা টের পেয়েছেন ৯:৩৬ এ। সকাল ৯ টা বেজে ৩৫ মিনিটে প্রচন্ড কাঁপুনিতে ঢাকা শহর কেঁপে ওঠে। বছরে আজ এটা দ্বিতীয় বারের মতো সর্বোচ্চ মাত্রার রেকর্ড স্পর্শ করেছে। একটু থেমে দ্বিতীয় কম্পনে শেষ হয় এই ভুমিকম্প। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৫.৫ মাত্রা। কোথাও ৫.৩, কেউ বলছেন ৫.৬ ,মাত্রা। ঝাঁকুনির সময়সীমা প্রায় ১১-১২ সেকেন্ড। এ বছর কম হলেও ১০ থেকে ১২ বার কেঁপেছে সারা বাংলাদেশ। আজও এর ব্যতিক্রম ছিল না। আজকের উৎপত্তিস্থল ছিল কুমিল্লা ও লক্ষীপুর। ভূ-তত্ত্ববিদরা কিন্তু বারবার সতর্ক করছেন। উনারা বলেন, ‘সাধারণত ভুমিকম্পের কেন্দ্রস্থল যত গভীর হয়, কম্পনের অনুভূতি ততো কম হয়। আর কেন্দ্রস্থল থেকে কম্পন যত উপরে উঠতে থাকে, কম্পন ততো প্রচন্ড ও তীব্র হতে থাকে। ঢাকা শহরে যে হারে বাড়িঘর নির্মিত হয়েছে। আরও নতুননতুন বাড়ি, বহুতল ভবনও রাজউক অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। অবকাঠামোগত উন্নয়ন বা ভুমিকম্প মোকাবিলায় সব কি টেকসই নির্মাণে গড়া? ঢাকার বেশিরভাগ ভবনই যত্রতত্র গা ঘেষাঘেষি করে করা। আর বেসমেন্ট দুর্বল বাড়িও খুঁজলে অঢেল পাওয়া যাবে। প্রায় সবই এখন ঝুঁকির তালিকায় পড়ে গেল। আসলে একটি বাড়ির মালিকই বলতে পারবেন। কার বাড়ির কেমন কন্ডিশন। যারা ঢাকায় থাকেন। কাজের টানেই শহেরে পড়ে থাকতে হয়। যাদের বেশির ভাগ মানুষ ভাড়াটিয়া। সবাই দেশের বিভিন্ন প্রান্তরের অধিবাসী।

ঢাকাতো ভুমিকম্পের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এটা কয়েক বছর থেকেই আমরা উপলব্ধি করছি।এছাড়াও চাঁদপুর, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ,মানিকগঞ্জ,নরসিংদী, দোহার, টাঙ্গাইল, সিলেট, চট্টগ্রাম উপকূলবর্তী এলাকা, বঙ্গোপসাগরের কূল ও মিয়ানমারের আসপাশ, বঙ্গোপসাগরের তলদেশ ও ভারতের মেঘালয়ের কাছেই ভুকম্পনের তীব্রতা বরাবর ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়। আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি হলে দরজা জানালা পর্যন্ত খুলে পড়েছে। কুমিল্লায় বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি মেঝেতে ফাটল দেখা দিয়েছে। এরকম বেঁকে যাওয়া, ফেটে যাওয়া শত শত হাজার হাজার বাড়িঘর বের হবে তদন্ত করলে। অনেকে এসব মাথায় নিয়েও ভাঙা ফাটলের নিচে রাতযাপন করছে। কেননা, ভুমিকম্পের পর নিজ বাড়ির ফাটলের প্রচারণা করে কেউ নিজের একটা বাড়তি হয়রানিতে পড়ার ঝুঁকি নিতে চাইবে না। অথচা সারা বাড়ির মানুষকে ঠিকই একটা পুরো ভবন ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে ঠিকেই রেখে দিলেন। এমন বাড়িওয়ালা কি নাই ঢাকা সহ বাংলার আনাচে কানাচে? আর যেসব ফাটল দৃশ্যত হয়। এর কারণ কি? সহজেই অনুমেয়, পুরাতন অবকাঠামো। এরকম নির্মাণ যা অনেক অনেক পুরনো হয়ে যাচ্ছে। ঢাকার অভ্যন্তরে গিজগিজ করছে হাজারে হাজার। বেড়িয়ে আসবে থলের বিড়াল। প্রশাসনিক গড়িমসিও এখানে একটি বড় সমস্যা। তবে এই অবহেলার বলিদান যে কতটা ভয়াবহ হবে। সেটা সময়ই বলে দেবে। আমরা তো চাই। অঘটন ঘটার আগে। মানুষ সতর্ক হবেন। সরকার হবেন কঠোর। আরও দায়িত্বশীল।

হঠাৎ ভুমিকম্পে আমরা নগরবাসীর কি করি। চোখে মুখে ভয় নিয়ে ঘর ছেড়ে বেরুনোর পথ খুঁজি। বিপদ ভেবে অনেকেই বাড়িঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। অনেকে বাড়ির ছাদে চলে যান। আতঙ্কে চেঁচামেচি করতে করতে। কুমিল্লায় যেটা হলো। একটি গার্মেন্টস’র ঘটনা। আতঙ্কে ভবন থেকে বের হতে গিয়ে হুড়োহুড়িতেই আহত হয়েছেন প্রায় শতশত কর্মী। এতবড় একটি শিল্প প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের কাপড়ের বুতোম লাগানোর ট্রেনিং দেয়ার আগে, প্রাকৃতিক বিপদ আপদে কি করণী, সেই নিয়ম কানুনটা শেখানো জরুরি। ভুমিকম্পের পর কে কি করেছে তখন। কে কোথায় ছিল। এই জাতীয় খোশগল্পেই মজে ছিলো ঢাকাবাসী।ভয়ডর যেন ক্ষণিকের ! অথচ আমরা ভাবছিনা। এ বছরে কিন্তু আজই প্রথম ভুমিকম্প নয়। বেশ কয়েকবার কয়েকমাস পরপর কিন্তু ভমিকম্প টের পেয়ে আশা জাতি আমরা। একবছরে এতবার ভুমিকম্প আমাদের কি বার্তা দিচ্ছে? মোটের কিন্ত শুভ বার্তা না। এইতো- মে মাসেও ভুমিকম্প হয়। এর মাত্রা ছিল ৪.৩। উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকার দোহার। অক্টোবরেও আবার সেই প্রাকৃতিক অনুশাসন। চরম আকারের ভয় ছুটিয়ে দেশ কাঁপিয়ে দেয়। ভারতের মেঘালয়ের রেসুবেলপাড়া থেকে উৎপত্তি নেয়া এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মাত্রা ছিল আজকের মতোই ৫.২। কঠিন রকমের ভয়াবহ পরিস্থিতি ডেকে আনার জন্য যথেষ্ঠ ছিল। সময়টা ছিল সন্ধ্যা ৬: ৪৫মিনিট। বোঝা যায় ভুমিকম্পের আঘাতের দিন-রাত কোন নির্দিষ্ট নয়। প্রাকৃতিক আঘাত দেশে আসছেই। দিনে কি রাতে। সামনে আরও কতটা প্রকট হয়। সেই ভয় কিন্তু এড়িয়ে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই। যদিও আবহাওয়া অফিষ এ জাতীয় আতঙ্কের পর, ভুমিকম্পকে মাঝারী আকার নামেই পাশ কেটে যায়। সচেতনতার বিষয়ে কোন পদক্ষেপ কিংবা সরকারকে আশু কোন সুপারিশের তাগিদের বিষয়ে কিছু বলছে না। সরু সুরু এলাকা মহল্লায় উুঁচু উঁচু বহুতল ভবনের ভীড়ে ঢাকা টিকে আছে বলা চলে ১৮ কোটি মানুষের দোয়ায়। আশির্বাদে।ইদানিং শহরের নিচু ঢেবে থাকা এলাকাগুলোতেও ডেভলপারদের শকুনি দৃষ্টি পড়েছে। আরও কত ভবন ঝুঁকির পরও নির্মাণ হচ্ছে। কিসের অনুমোদন আর কিসের কৈফিয়ত ! ঢাকার বাড়িঘরের মধ্যে এখনও এমনও বহু পুরনো আমলের বাড়ি্কেআছে। যেগুলো কোনমতে টিকে আছে। বিনা অবকাঠামো ও নাগরিক জীবনের ঝুঁকি মাথায় !

রাজউক সহ রিহ্যাব প্রত্যেককে আগামীর নির্মানে অসহায় অধিবাসীদের নিরাপদ জীবনকে সম্মান দেখানো উচিত। ৫.২ কি ৫.৩ রিখটার স্কেলের মাত্রার ভুমিকম্পের ভয়ে কে কার আগে জীবন বাঁচাতেই যদি শত মানুষ পায়ের নিচে পিষ্ট হয়ে নিজেরাই নিজেদের জীবনের জন্য হুমকী হই? তাহলে ফিলিপাইনের মতো ৭.৬ মাত্রার ভুমিকম্পে আমাদের জীবনের কি হবে? কঠিন এক ট্রাজেডীতে তো রিখটার স্কেল মেশিনটাই বিবেকের তাড়নায় নিজে থেকে মনে হয় থমকে যাবে ! কোথায় যাব আমরা ? কে কাকে উদ্ধার করবে ? এই ঢাকা শহরের মানুষসৃষ্ট মৃত্যুকুপ থেকে। বিবেক সেটাই জানতে চায়।

শুধু টাকার জন্য জীবন নয়। সুস্থ দেহে, নিরাপদে বেঁচে থাকা, আমাদের অধিকার।

মারুফ আহমেদ, বিশেষ প্রতিনিধি

Photo: a net symbolic image