কামরাঙ্গীর চরে বেপরোয়া কিশোর গ্যাং…ও মাদক


এম.এ.টি রিপন প্রকাশের সময় : নভেম্বর ২, ২০২০, ৫:২০ অপরাহ্ন / ৩৭
কামরাঙ্গীর চরে বেপরোয়া কিশোর গ্যাং…ও মাদক

মোঃনাদিম সরকারঃঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন-ডিএসসিসি ৫৫, ৫৬ ও ৫৭ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে কামরাঙ্গীর চর থানা এলাকা গঠিত। আয়তনে ছোট হলেও এই জনপদে প্রায় ১৬ লাখ মানুষের বসবাস। মধ্যবিত্ত ও নিন্ম আয়ের মানুষগুলোর বেশির ভাগই এই কামরাঙ্গীর চরে বসবাস করে। বিশাল এই জনগোষ্ঠির অন্যতম প্রধান সমস্যা মাদক। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ অভিযানেও এখানকার মাদক কারবারে ভাটা পড়েনি। সন্তানদের সঠিকভাবে বেড় ওঠা নিয়ে চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে থাকেন অভিভাবকরা।

৫৬ নং ওয়ার্ডের পূর্ব রসুলপুরের ১ নং গলির একটি ক্লাবকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বেপরোয়া এই মাদক ব্যবসা। সন্ধ্যা নামার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এখানে চলে মাদকের কেনা বেচা। এই ক্লাবের মাদক সম্রাট হিসাবে পরিচিত কামাল। কামালের সহযোগী হিসাবে কাজ করে গরু রনি, হুন্ডা সোহেল, সুমন, শাহজাহানের ছেলে রফিক, ছিনতাইকারী ভোমা শাহিন, রংপুইরা ফজলু ও টুন্ডা স্বপন। খবর নিয়ে জানা যায় টুন্ডা স্বপন চুরি, ডাকাতিসহ অসংখ্য মামলার আসমী। মুলত উঠতি বয়সী কিশোরদের ব্যবহার করা হয় মাদক বিক্রেতা হিসাবে। মাদক বিক্রি করতে করতে এক সময় এই কিশোররাই হয়ে ওঠে ভয়ংকর সন্ত্রাসী। এলাকা কেন্দ্রীক আধিপত্য বিস্তারের নামে তারা গড়ে তোলে কিশোর গ্যাং।
খোজ নিয়ে জানা গেছে, কামরাঙ্গীর চরে মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত প্রায় ৫০ টি গ্যাং। এর মধ্যে বৃহৎ গ্যাংটি পরিচালানা করে এবং মুলহোতা হিসেবে নাম উঠে এসেছে পূর্ব রসুলপুরের ৭নং গলির সুমন ওরফে অঘা সুমন এবং ৬ নং গলির আশিকুজ্জামান বাবু, কবির, বিল্লাল, মদট্টি মনির ও রানা ওরফে ভাইগনা রানা মুলত কিশোর গ্যাং এরাই নিয়ন্ত্রন করে পাশাপাশি মাদকের মুল সিন্ডিকেট হিসাবেও কাজ করে এবং ছিনতাইকারী হিসাবে কাজ করে মোটু শুভ। এছাড়া, ২ নম্বর পূর্ব রসুলপুরের ভোলাইয়া মফিজুল বিদ্যুৎ অফিস গলির ফ্লাক্সি রুবেল, একই গলির মনসুর মিয়ার ছেলে বিল্লাল, পশ্চিম রসুলপুর জিরো পয়েন্টের হানিফ, সানি, রানা, মিঠু, ভুট্টু ও নুরা এবং ৩ নং গলির বোচন মাদক ব্যবসার মাঠ পর্যায়ের নিয়ন্ত্রক।
এখানকার মাদকের মধ্যে মুলত ইয়াবাই সবথেকে বেশি চলে। পাশাপাশি গাজা বিক্রিও চলে অনেকটা প্রকাশ্যে।
মাদক সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিশেষ করে পুলিশ নিয়মিত অভিযান চালালেও এরা সব সময় থেকে যায় ধরা ছোয়ার বাইরে। পুলিশের অভিযানের খবর পুলিশের সোর্সের মাধ্যমে আগে থেকেই জেনে যায় চতুর এই সিন্ডিকেট সদস্যরা। ফলে সহজেই গা ঢাকা দেয় তারা। জানা যায় এদের অনেকের বিরুদ্ধেই থানায় একাধিক মামলা রয়েছে তবে মামলায় গ্রেপ্তার হলেও কয়েকদিন পরে জামিনে বের হয়ে আগের থেকে আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠে তারা। মাঝে মধ্যে দু’একজন চুনোপুটি ধরা পড়লেও রাঘব বোয়ালরা আড়ালেই থেকে যায়।
একাধিক মাদকসেবী, বিক্রেতা ও ভুক্তভোগী জানান, প্রতিদিন ভোরে পূর্ব রসুলপুর ২ নম্বর ব্রিজ এলাকা দিয়ে কামরাঙ্গীর চরে ইয়াবাসহ অন্য মাদকদ্রব্য অবাধে ঢুকছে। পিকআপ ভ্যান ও মোটরসাইকেলে করে এসব মাদকদ্রব্য কামরাঙ্গীর চরে আসে। অনেক সময় কিশোরী মেয়েদের মাধ্যমেও এই মাদক সরবারাহ করা হয়। এছাড়া কেরানীগঞ্জের কালন্দী থেকে নৌকায় করে খোলামোড়া ঘাট হয়ে মাদক ঢুকছে। মাদক কারবারিরা নির্দিষ্ট স্থানে বসে মাদক বিক্রি করে না এবং পুলিশের হাতে ধরা পড়ার ভয়ে বাসায়ও মাদক রাখে না। তবে জানা যায় এলাকার বেশ কিছু গ্যারেজেকে ব্যবহার করা হয় ইয়াবা ও গাঁজা বিক্রীর আস্তানা হিসাবে।

এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কামরাঙ্গীর চরের অর্ধশতাধিক স্থানে ইয়াবা, হেরোইন, গাঁজা ও ফেনসিডিল কারবার চলছে।
সূত্রগুলো বলছে, ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব রসুলপুরের ৫ ও ৬ নম্বর সড়কের উত্তর খালপাড় সড়কে মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ করেন ইয়াবার ‘ডিলার’ বাবু।
৭ ও ৮ নম্বর সড়ক ও আশপাশের এলাকা নিয়ন্ত্রণ করেন ‘ডিলার’ সুমন ওরফে অঘা সুমন ও আশিকুজ্জামান বাবু।

মাদকের বিষয়ে ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর মোহাম্মদ হোসেন বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে অনেকেই রাজনীতি করে। কিছু লোক এগুলো করতে পারে। তবে সুস্পষ্টভাবে কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কামরাঙ্গীর চরে তিন নারী, যাঁরা ‘মাদক সম্রাজ্ঞী’ হিসেবে পরিচিত—তাঁদের পুরো পরিবার মাদক কারবারে জড়িত। এদের একজন হলেন রনি মার্কেট মোড়ের বিউটি, তিনি তার স্বামী রাজ্জাক, দুই মেয়েজামাই ও ভাই শামছুকে নিয়ে মাদক ব্যবসায়ের কারবার চালান। প্রায়ই গ্রেপ্তার হলেও জামিনে ছাড়া পেয়ে কারবার চালিয়ে যাচ্ছেন আরো বেপরোয়া ভাবে। আরেকজন পশ্চিম রসুলপুরের বি-ব্লকের ৩ নম্বর গলির ১৬ নম্বর বাড়ির বাসিন্দা শাহিনুর বেগম ওরফে শাহনাজ বেগম তিনি কামরাঙ্গীর চর ও নিউ মার্কেট এলাকায় মাদক কারবার করেন। তাঁর স্বামীর নাম বাবু ওরফে মোবাইল বাবু। নয়াগাঁও ২৫২ নম্বর মুড়ির ফ্যাক্টরির পাশে থেকে কারবার করেন খুরশিদা বেগম ওরফে খুশি ও তাঁর বোন হাসি। স্থানীয় লোকজন বলছে, অভিযান শুরু হলে খবর পেয়ে দুই বোন গাঢাকা দেয়।
রনি মার্কেটের আলোড়ন স্কুল গলির হাকিমের ছেলে মনির হোসেন শাকিল রহমতবাগে ছাত্রলীগকর্মী পরিচয় দিয়ে মাদক কারবার করেন থাকে জানা যানা সে কামরাঙ্গীর চর থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি বিপ্লবের নামও মাদক ব্যবসা করতে গিয়ে ব্যবহার করে থাকে। এছাড়াও শাকিলের সাথে আরো আছে মুরগি সোহেল, মাৎস ব্যবসায়ী পারভেজ ও ৯ নং গলির নোয়াখাইল্লা কালা সুমন। এলাকাবাসীর অভিযোগ, গণপাঠাগারে বই পড়ার আড়ালে দেদাছে চলছে মাদক ব্যবসা। এমনিতেই এলাকাটি ঘনবসতিপূর্ণ হওয়া সবার কাছে কামরাঙ্গীর চর মাদকের আখড়া হিসেবে পরিচিত। এখানকার বেশির ভাগ মানুষই নিম্ন আয়ের ও অশিক্ষিত তাই তারা মাদক ব্যবসাকে আয় রোজগারের পথ হিসাবে বেছে নেয়। ঢাকা শহরের অন্যান্য স্থানের তুলনায় এখানে মাদক সেবী ও বিক্রেতার সংখ্যা অনেক বেশি। খোজ নিয়ে জানা যায় কামরাঙ্গীর চর থানায় প্রতি মাসে মাদকসহ অন্যান্য বিষয়ে প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি মামলা হয়। কামরাঙ্গীর চর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জনাব মোস্তাফিজুর রহমান জানান মাদকদের বিরুদ্ধে সরকার রাষ্ট্রীয়ভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে তাই আমরা কখনই মাদককে প্রশ্রয় দিবো না এবং মাদকের বিষয়ে কোন ছাড় নয়।