ক্ষমতার চেয়ার ও কারাগার খুব পাশাপাশি


এম.এ.টি রিপন প্রকাশের সময় : ডিসেম্বর ২৮, ২০২০, ৮:৫৯ পূর্বাহ্ন / ২৮
ক্ষমতার চেয়ার ও কারাগার খুব পাশাপাশি

ক্ষমতার চেয়ার ও কারাগার খুব পাশাপাশি

ক্ষমতার চেয়ার আর কারাগার খুব পাশাপাশি থাকে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল সকালে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে জাতীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের নতুন বিমান ‘ধ্রুবতারা’সহ বেশ কয়েক প্রকল্প উদ্বোধন শেষে তিনি এই মন্তব্য করেন। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভিভিআইপি টার্মিনালে আয়োজিতে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গণভবন থেকে যুক্ত হন প্রধানমন্ত্রী। অনুষ্ঠানে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী মাহাবুব আলীসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন। গণভবন প্রান্তে অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আহমদ কায়কাউস।
শুরুতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে সদ্য যুক্ত হওয়া নতুন ‘ড্যাশ ৮-৪০০ ধ্রুবতারা’ নিয়ে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। এছাড়াও কেরানীগঞ্জে মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগার, দেশের বিভিন্ন স্থানে নবনির্মিত ২০টি ফায়ার স্টেশন, জেলা সদরে নবনির্মিত ৬টি আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস এবং একটি এলপিজি স্টেশন উদ্বোধন করেছেন তিনি।
সকলের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রাখতে বাধ্য হচ্ছি: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, করোনাভাইরাস এসে আমাদের সবকিছু ওলটপালট করে দিয়েছে, সমস্ত কর্মকাণ্ডকে স্থবির করে দিয়েছে। সবার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রাখতে আমরা বাধ্য হচ্ছি। এটা শুধু বাংলাদেশের নয় সমগ্র বিশ্বব্যাপীই এই সমস্যাটা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এই নতুন বিমানের উদ্বোধন করেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আঞ্চলিক পর্যায়ে একটি সার্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়। যোগাযোগ ব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়নের মাধ্যমে আমরা আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে একটি সার্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই। তিনি বলেন, আমরা সেই সব বিমান ক্রয় করছি যেগুলো সব থেকে আধুনিক এবং উন্নতমানের। আর আজকে যে বিমানটি উদ্বোধন করতে যাচ্ছি তার মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের পাশাপাশি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গেও আমরা যোগাযোগ বৃদ্ধিতে সক্ষম হবো। নতুন বিমানটির নাম তিনি ধ্রুবতারা রেখেছেন এবং নতুন আনা বিমানগুলোর নামকরণ দেশের প্রকৃতি ও পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তিনিই করেছেন, যে কাজে তাকে ছোট বোন শেখ রেহানা সহযোগিতা করেছে বলেও প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন। যেগুলোর মধ্যে রয়েছে- পালকি, অরুণ আলো, আকাশ প্রদীপ, রাঙ্গা প্রভাত, মেঘদূত, ময়ূরপঙ্ক্ষী, আকাশবীনা, হংস বলাকা, গাঙ্গচিল, রাজ হংস, অচিনপাখি, সোনারতরি। আর আজ যেটা উদ্বোধন করতে যাচ্ছি সেটা ধ্রুবতারা, বলেন তিনি। ‘ধ্রুবতারা’ আমাদেরকে দিকনির্দেশনা দেয় উল্লেখ করে সরকার প্রধান বলেন, আমরা জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন করতে যাচ্ছি আর ২০২১ সালে আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপিত হবে। কাজেই এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই ধ্রুবতারা নামটি পছন্দ করেছি। এ নামগুলো পছন্দ করায় আমাকে সহযোগিতা করেছেন আমার ছোট বোন শেখ রেহানা। তিনি এ সময় নতুন বিমান আনায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ বিমানের পদক্ষেপকে ‘অত্যন্ত সাহসী’ আখ্যায়িত করে সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনকালে একটি স্বাধীন দেশের উপযোগী করে সকল প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার যে উদ্যোগ জাতির পিতা নিয়েছিলেন তা যদি পরবর্তী সরকারগুলো অনুসরণ করতো তাহলেও দেশ অনেক দূর এগোতে পারতো। কিন্তু দুর্ভাগ্য তা হয়নি। অবশ্য ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ যখন আবার ক্ষমতায় আসে তার পরেই এদেশে উন্নয়নের যাত্রা আবার শুরু হয়। এ সময় দেশে নতুন নতুন বিমান বন্দর প্রতিষ্ঠা এবং পুরাতন বিমান বন্দরগুলোর আধুনিকায়নসহ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নতুন টার্মিনাল, কার্গো টার্মিনাল এবং বোর্ডিং ব্রিজ করা থেকে শুরু করে সরকারের চার মেয়াদে বিমানকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে চলাচলের উপযোগী করে তোলায় সরকারের পদক্ষেপ সমূহের উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটির সদস্যগণ, সচিব এবং বাংলাদেশ বিমানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ এবং ঊর্ধ্বতন সামরিক এবং বেসামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ এ সময় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জ থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে অনুষ্ঠানে সংযুক্ত ছিলেন। বিমানের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে সদ্য যুক্ত হওয়া সর্বাধুনিক প্রযুক্তি সংবলিত সম্পূর্ণ নতুন ১ম ড্যাশ ৮-৪০০ এয়ার ক্রাফট হচ্ছে এই ধ্রুবতারা। বাংলাদেশ ও কানাডা সরকারের মধ্যে জি-টু-জি ভিত্তিতে ক্রয়কৃত ৩টি ড্যাশ ৮-৪০০ উড়োজাহাজের মধ্যে প্রথমটি এটি। কানাডার প্রখ্যাত উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ডি হ্যাভিল্যান্ড নির্মিত, ৭৪ আসনবিশিষ্ট ড্যাশ ৮-৪০০ উড়োজাহাজটি পরিবেশবান্ধব এবং অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা সমৃদ্ধ।
২০টি ফায়ার স্টেশনসহ বেশ কয়েকটি প্রকল্পের উদ্বোধন: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নতুন ২০টি ফায়ার স্টেশন এবং ৬টি আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস গতকাল উদ্বোধন করেন। তিনি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার কেরানীগঞ্জ কারা কমপ্লেক্স এলাকায় মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগার এবং কেরানীগঞ্জে একটি এলপিজি স্টেশনও উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে ফায়ার সার্ভিসের আধুনিকায়নের চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগুনে জীবন ও সম্পদের অনেক ক্ষতি হয়। আমাদের সরকার গঠনের আগে এত ফায়ার স্টেশন ছিল না। আমরা দেশের প্রতিটি উপজেলায় একটি করে ফায়ার স্টেশন নির্মাণ করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি। পৃথক বার্ন ইনস্টিটিউট করেছি, মানুষের জীবন যেন নিরাপদ হয় সেভাবেই আমরা কাজ করে যাচ্ছি।  যেসব ফায়ার স্টেশন উদ্বোধন হয়েছে, সেগুলো হচ্ছে- নওগাঁ জেলার রানীনগর, রাজশাহীর মোহনপুর, পাবনার সাঁথিয়া ও আটঘরিয়া, শরীয়তপুরের জাজিরা, বগুড়ার আদমদীঘি ও শাজাহানপুর, জয়পুরহাট, সাতক্ষীরার আশাশুনি ও কলারোয়া, বরিশালের হিজলা, পিরোজপুরের ইন্দুরকানি, মৌলভীবাজারের রাজনগর, নাটোর, চাঁপাই নবাবগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর, কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ, নেত্রকোনার বারহাট্টা, মানিকগঞ্জের হরিরামপুর এবং চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ। ফায়ার সার্ভিসকে আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষ করা হচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৯৯৯-এ ফোন দিলে যেকোনো ধরনের সমস্যার সমাধান পাওয়া যায়। সম্প্রতি হিমছড়িতে একদল শিক্ষার্থী হারিয়ে যাওয়ার পর ৯৯৯-এ কল দিলে পুলিশ বিমানবাহিনীর সাহায্য নিয়ে তাদের উদ্ধার করে। এ থেকে বোঝা যায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করলে যেকোনো বিপদ থেকে মানুষকে উদ্ধার করা যায়। আমরা ফায়ার সার্ভিসকে সেভাবে গড়ে তুলবো। নতুন ৬টি আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের মাধ্যমে পাসপোর্ট সংক্রান্ত সেবা নাগরিকদের আরো কাছে চলে যাবে বলেও প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে উল্লেখ করেন। এদিন কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার এলাকায় ১১ একর জমির ওপর প্রায় ৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ে মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগার উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী বলেন, কারাগারগুলোতে যখন কেউ গ্রেপ্তার হয়ে আসে তখন তার পরিবার কিন্তু কষ্ট পায়। তাছাড়া এতগুলো লোক বেকার বসে থাকবে কেন। যে কারণে, তাদের ট্রেনিং করানো এবং তাদের মাধ্যমে কিছু পণ্য উৎপাদন এবং সেসব পণ্য বাজারজাতকরণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর মাধ্যমে কয়েদিরা খরচ বাদ দিয়ে কিছু টাকা জমাতে পারবে এবং চাইলে পরিবারকেও পাঠাতে পারবে এবং সব থেকে বড়কথা এর মাধ্যমে কারামুক্তির পর সমাজে সে পুনর্বাসিত হওয়ার একটি সুযোগ পাবে- বলেন প্রধানমন্ত্রী। এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় নিজের কারাবন্দি হওয়ার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা যারা রাজনীতি করি, আমাদের ক্ষমতার চেয়ার ও কারাগার খুব পাশাপাশি থাকে। যেটা খুবই স্বাভাবিক। ২০০৭-এ যেটা হয়েছে, ক্ষমতা ছাড়াও কিন্তু সবার আগে আমাকেই গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। কাজেই সেটা আমরা জানি, রাজনীতি করতে গেলে এটা হবে। সংগ্রামী জীবনে বঙ্গবন্ধুর বারবার জেল খাটার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু অপরাধ করলেই যে জেলে যায় তা নয়। এর মধ্যে ১৯৪৮ সালে যখন আমাদের মাতৃভাষা বাংলার অধিকার কেড়ে নিয়েছিল, তখন জাতির পিতা যে প্রতিবাদ করেছিলেন, সে প্রতিবাদের কারণে কারাগারে যেতে শুরু করেন। তারপর তার জীবনের অনেকটা সময় কারাগারে কাটাতে হয়েছে অত্যন্ত মানবেতরভাবে। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে কারাগারে যাওয়ার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, কারাগারের সঙ্গে সব সময় আমাদের একটা সম্পর্ক আছে। ছোটবেলা থেকেই কারাগারে যাই, সেখানকার ভালো-মন্দ অনেক কিছু জানারও সুযোগ হয়। জাতির পিতার কারাগারের রোজনামচা ও অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়লে কারাগার সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারবেন। কেরানীগঞ্জে একটি এলপিজি স্টেশনও উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। এই স্টেশন থেকে কেন্দ্রীয় কারাগারে গ্যাস সংযোগ দেয়া হয়েছে। ফলে, এখন থেকে আর কাঠ পুড়িয়ে রান্না করতে হবে না। এলপিজি গ্যাসে রান্না হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কারাগারে কাঠ পুড়িয়ে রান্নার মাধ্যমে পরিবেশের ক্ষতি প্রতিরোধের জন্য সেখানে এলপিজি স্টেশন করে দেয়া হয়েছে। স্টোরেজ থেকে গ্যাস কারাগারের যেসব চৌকিতে রান্না হবে সেখানে লাইনের মাধ্যমে সরবরাহ করা হবে। কাজী আলাউদ্দিন রোডস্থ ফায়ার সার্ভিস সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান ভার্চ্যুয়ালি অনুষ্ঠানে সম্পৃক্ত হয়ে বক্তৃতা করেন।