ভাড়া বাড়ছে সব ফেরির


এম.এ.টি রিপন প্রকাশের সময় : এপ্রিল ২৩, ২০২২, ১১:২৩ পূর্বাহ্ন /
ভাড়া বাড়ছে সব ফেরির

দেশের ছয়টি রুটের ফেরিতে সব ধরনের গাড়ি পারাপারের ভাড়া ২০ শতাংশ হারে বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) নৌযানেও যাত্রীপ্রতি ভাড়া ৩৫ শতাংশ হারে বাড়ছে। সম্প্রতি নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে।

তবে ঈদের আগে নতুন ভাড়া কার্যকর হচ্ছে না। ১৯ এপ্রিল মন্ত্রণালয় থেকে নতুন ভাড়ার বিষয় জানিয়ে বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যানকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এতে জ্বালানি তেল, পরিচালন, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রশাসনিক ব্যয়বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে ভাড়া বাড়ানোর বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।

একই সঙ্গে নতুন ভাড়া কার্যকর করার লক্ষ্যে পূর্ণাঙ্গ একটি প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে বলা হয়েছে। যদিও ফেরিতে ২০ শতাংশ ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্তে খুশি নয় বিআইডব্লিউটিসি কর্তৃপক্ষ। তারা গাড়ি পারাপারে অন্তত ৩৫ শতাংশ ভাড়া বৃদ্ধির পক্ষে। নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয় ও বিআইডব্লিউটিসি সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

জানা যায়, ২০ শতাংশ ভাড়া বাড়লে ফেরিতে পাটুরিয়া থেকে দৌলতদিয়া পাড়ি দিতে পাঁচ থেকে আট টন পণ্যবাহী ট্রাকের ভাড়া ১০৬০ থেকে বেড়ে ১৩০০ টাকা হবে। এ রুটে একটি বড় বাসের যাত্রীসহ ভাড়া ১৮২০ টাকা। নতুন ভাড়া কার্যকর হলে তা বেড়ে ২১৬০ টাকায় দাঁড়াবে। একটি প্রাইভেট কার বা জিপের ৪৫০ টাকার স্থলে ৫৪০ টাকা হবে।

একই হারে অন্যান্য রুটে সব ধরনের যানবাহন পারাপারের ভাড়া বেড়ে যাবে। অপরদিকে লঞ্চে যাত্রীপ্রতি ৩৫ শতাংশ ভাড়াবৃদ্ধির সঙ্গে ভ্যাটও যুক্ত হবে। পরিবহণ সংশ্লিষ্টরা জানান, নতুন ভাড়া কার্যকর হলে তা ব্যবসায়ী ও যাত্রীদের থেকেই আদায় করা হবে।

নতুন ভাড়াবৃদ্ধির সিদ্ধান্তের বিষয়ে বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান আহমদ শামীম আল রাজীর সঙ্গে যুগান্তরের কথা হয়। তিনি বলেন, বিআইডব্লিউটিসির ফেরি ও যাত্রীবাহী নৌযানে ২০ শতাংশ ভাড়া বাড়ানো যেতে পারে উল্লেখ করে নৌ মন্ত্রণালয় আমাদের চিঠি দিয়েছে। নতুন ভাড়া কবে কার্যকর করা হবে, এ বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

আসন্ন ঈদুলফিতরের পর এ ভাড়া কার্যকর হতে পারে। তিনি বলেন, আমাদের কারিগরি কমিটি হিসাবনিকাশ করে দেখেছে, অন্তত ৩৫ শতাংশ ভাড়া না বাড়ালে ব্রেক ইভেনে থাকতে পারি না। বিষয়টি নিয়ে আমরা আবারও মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলব। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আসন্ন ঈদে ৪৯টি ফেরিতে গাড়ি পারাপার হবে। দুটি ফেরি ভারী মেরামতে থাকায় সেগুলোয় নামানো যাচ্ছে না।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ৪ নভেম্বর থেকে সরকার জ্বালানি তেলের মূল্য ৬৫ থেকে বাড়িয়ে ৮০ টাকা নির্ধারণ করে। দাম বৃদ্ধির হার ২৩ শতাংশ। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর ঢাকার ভেতরে বাসের ভাড়া ২৬.৫ ও দূরপাল্লার রুটের বাসে ২৭ শতাংশ বাড়িয়েছে সড়ক পরিবহণ ও সেতু মন্ত্রণালয়। অপরদিকে লঞ্চের ভাড়া ৩৫ দশমিক ২৯ শতাংশ বাড়ায় নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়। তবে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও ফেরিতে আগের ভাড়ায় গাড়ি ও নৌযানে যাত্রী বহন করে আসছে বিআইডব্লিউটিসি।

প্রসঙ্গত, ২০১৩ সালে ফেরিতে বাস ও ট্রাক ছাড়া অন্যান্য যানবাহন পারাপারে ২০ শতাংশ ভাড়া বাড়িয়েছিল বিআইডব্লিউটিসি। ওই সময়ে যাত্রীবাহী নৌযানে জনপ্রতি ভাড়া বাড়ানো হয় ৪০ শতাংশ। পরে ২০১৬ সালে লাহারহাট-ভেদুরিয়া এবং ২০১৭ সালে ভোলা-লক্ষ্মীপুর রুটে ফেরিতে গাড়ি পারাপারে ভাড়া বাড়িয়েছিল বিআইডব্লিউটিসি।

জানা যায়, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পরিপ্রেক্ষিতে গত বছর ১ ডিসেম্বর ফেরিতে গাড়ি পারাপারে ২৫ এবং নৌযানে যাত্রীপ্রতি ২০ শতাংশ ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়। পরে সংস্থাটির পরিচালক (কারিগরি) রাশেদুল ইসলামকে প্রধান করে একটি কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি সবদিক বিবেচনায় নিয়ে কয়েকটি খাতের ব্যয় বিশ্লেষণ ও মুনাফা ধরে ৫৫ শতাংশ ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব করে। তবে ব্রেক ইভেনে থাকতে হলে ৩৫ শতাংশ ভাড়া বৃদ্ধির সুপারিশ করে। ওই প্রস্তাব পর্যালোচনা করে নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয় ফেরিতে গাড়ি পারাপারে ২০ শতাংশ ভাড়া বৃদ্ধিতে সম্মতি জানাল।

কোন রুটে ভাড়া কত বাড়বে : জানা যায়, বর্তমানে ছয়টি রুটে ফেরিতে গাড়ি পারাপার করছে বিআইডব্লিউটিসি। রুটগুলো হচ্ছে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া, আরিচা-কাজিরহাট, শিমুলিয়া-বাংলাবাজার/মাঝিরকান্দি, চাঁদপুর-শরীয়তপুর, ভোলা-লক্ষ্মীপুর এবং লাহারহাট-ভেদুরিয়া। এছাড়া ঢাকা-বরিশাল-মোড়েলগঞ্জ, চট্টগ্রাম থেকে সন্দ্বীপ, হাতিয়া, দৌলতখান ও বরিশাল এবং ঢাকা-কালীগঞ্জ রুটে চলে সংস্থাটির বেশকিছু যাত্রীবাহী নৌযান।

বর্তমানে সংস্থাটির বহরে ১০২টি ফেরি ও যাত্রীবাহী নৌযান রয়েছে। বিআইডব্লিউটিসির প্রস্তাব বিশ্লেষণে দেখা যায়, পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া রুটে এক থেকে তিন টন পণ্যবাহী ছোট ট্রাক বা কাভার্ড ভ্যানের ভাড়া ৭৪০ থেকে বাড়িয়ে ৯০০ টাকা, ৩-৫ টনের ট্রাক ৮৮০ থেকে বেড়ে ১১০০ টাকা; ৫-৮ টন পণ্যবাহী ট্রাক, লরি ও কাভার্ড ভ্যানের ভাড়া ১০৬০ থেকে বাড়িয়ে ১৩০০ এবং ৮-১১ টনের বড় ট্রাক ও লরির ভাড়া ১৪৬০ থেকে বাড়িয়ে ১৮০০ টাকা দাঁড়াবে।

এ রুটের মিনি বাস বা কোস্টার ৯০০ থেকে বেড়ে ১০৫০ টাকা, মাঝারি মাপের বাস দিনে ১৫৮০ টাকার স্থলে ১৮৩০ টাকা ও রাতে ১৬২০ টাকার স্থলে ১৮৭০ টাকা এবং বড় বাসে ১৮২০ টাকার স্থলে ২১৬০ টাকা ভাড়া গুনতে হবে। এছাড়া মাইক্রোবাস ও অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া ৮০০ টাকার স্থলে এক হাজার টাকা, পাজেরো গাড়ি ৭৩০ টাকার স্থলে ৯০০ টাকা, কার ও জিপ ৪৫০ টাকার স্থলে ৫৪০ টাকা, মোটরসাইকেল ৭০ টাকার স্থলে ৯০ টাকা হবে। সূত্র জানায়, পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া এবং আরিচা-কাজিরহাট রুটে প্রতিদিন গড়ে আট হাজার গাড়ি পারাপার হয়।

অপরদিকে শিমুলিয়া-বাংলাবাজার বা মাঝিরকান্দি রুটে এক থেকে তিন টন পণ্যবাহী ছোট ট্রাক বা কাভার্ড ভ্যানের ভাড়া ৯৮০ থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ২০০ টাকা, ৩-৫ টনের ট্রাক ১ হাজার ৮০ থেকে বেড়ে ১ হাজার ৩০০ টাকা; ৫-৮ টন পণ্যবাহী ট্রাক, লরি ও কাভার্ড ভ্যানের ভাড়া ১ হাজার ৪০০ থেকে বেড়ে এক হাজার ৭০০ টাকা এবং ৮-১১ টনের বড় ট্রাক ও লরির ভাড়া ১ হাজার ৮৫০ থেকে বেড়ে ২ হাজার ২২০ টাকা দাঁড়াবে।

এ রুটের মিনি বাস বা কোস্টার ১ হাজার ২০০ থেকে বেড়ে ১ হাজার ৪০০ টাকা, মাঝারি মাপের বাস দিনে ১ হাজার ৭৮০ টাকার স্থলে ২ হাজার ৮০ টাকা ও রাতে ১ হাজার ৮২০ টাকার স্থলে ২ হাজার ১২০ টাকা এবং বড় বাসে ১ হাজার ৯৪০ টাকার স্থলে ২ হাজার ২৬০ টাকা ভাড়া গুনতে হবে। এছাড়া মাইক্রোবাস ও অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া ৮৬০ টাকার স্থলে ১ হাজার ৫০ টাকা, পাজেরো গাড়ি ৮০০ টাকার স্থলে ১ হাজার টাকা, কার ও জিপ ৫০০ টাকার স্থলে ৬০০ টাকা এবং মোটরসাইকেল ৭০ টাকার স্থলে ৯০ টাকা হবে। একইভাবে প্রতিটি রুটে ভাড়া বেড়ে যাবে।

নতুন ভাড়া কার্যকর হলে বেসরকারি লঞ্চের মতো বিআইডব্লিউটিসির লঞ্চ ও স্টিমারে ভাড়া আদায় করা হবে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর লঞ্চভাড়া প্রথম ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত ১ টাকা ৭০ পয়সার পরিবর্তে ২ টাকা ৩০ পয়সা এবং ১০০ কিলোমিটারের পরে প্রতি কিলোমিটার ১ টাকা ৪০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা নির্ধারণ কর হয়। সর্বনিম্ন ভাড়া ১৮ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ টাকা করা হয়। এই ভাড়া এখন বিআইডব্লিউটিসির নৌযানেও প্রযোজ্য হবে।